নারায়ণগঞ্জে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির

জেলাজুড়ে রাজনীতি

মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার অজুহাতে কমিটি বিলুপ্ত করার পর প্রায় দুই বছর হতে চললেও পুনর্গঠনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। ফলে চরম অনিশ্চয়তা ও গভীর হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের ত্যাগী ও পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীরা।

রাজপথের ‘ভ্যানগার্ড’ হিসেবে পরিচিত সংগঠনটির অভিভাবকত্ব না থাকায় জেলার তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রমে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে নির্দেশনা না এলে রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন আরও কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয় সাবেক ছাত্রনেতারা।

সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২৬ জানুয়ারি নাহিদ হাসান ভূঁইয়াকে সভাপতি ও জুবায়ের রহমান জিকুকে সাধারণ সম্পাদক করে ৯ সদস্যের জেলা কমিটি এবং রাকিবুর রহমান সাগরকে সভাপতি ও রাহিদ ইসতিয়াক সিকদারকে সাধারণ সম্পাদক করে ৬ সদস্যের মহানগর ছাত্রদলের আংশিক কমিটি অনুমোদন দিয়েছিল কেন্দ্র।

তবে দেড় বছর অতিবাহিত হলেও এই কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর ১৭ সেপ্টেম্বর এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জেলা, মহানগর ও অধীনস্থ সকল অধীনস্থ ইউনিট কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।

তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠলেও সাবেক নেতারা তা অস্বীকার করে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টিকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

কমিটি বিলুপ্তির পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো আহ্বায়ক বা পূর্ণাঙ্গ কমিটি পায়নি নারায়ণগঞ্জ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই কমিটি ঘোষণার গুঞ্জন থাকলেও নির্বাচন পরবর্তী দীর্ঘ সময়েও কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

এদিকে কমিটি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে নারায়ণগঞ্জ ছাত্রদলের একাধিক সাবেক দায়িত্বশীল ও পদপ্রত্যাশী নেতা জানান, রাজপথে দিনের পর দিন হামলা, মামলা ও নির্যাতন সহ্য করে যারা দলকে টিকিয়ে রেখেছেন, তারা এখন পরিচয়হীনতায় ভুগছেন।

ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদল বরাবরের মতোই ‘ভ্যানগার্ড’ হিসেবে সম্মুখ সারিতে থেকে লড়াই করেছে। কিন্তু দীর্ঘ দুই বছর ধরে নারায়ণগঞ্জে আমাদের কোনো অভিভাবক বা সাংগঠনিক পরিচয় নেই।

শীর্ষ পর্যায় থেকে দিকনির্দেশনা না থাকায় মাঠপর্যায়ের শত শত উদীয়মান কর্মী রাজপথে নেমেও সংগঠিত হতে পারছেন না। কেন্দ্রের এই উদাসীনতা ও নীরবতা তৃণমূলের ত্যাগী কর্মীদের মানসিক বল ভেঙে দিচ্ছে। জাতীয়তাবাদী শক্তির মূল ভিত্তি ছাত্রদলকে এভাবে নেতৃত্বহীন রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”

তারা আরও যোগ করেন, “আমরা পদ-পদবীর চেয়ে দলীয় আদর্শ ও গতিশীলতাকে বড় করে দেখি। তবে একটি নির্দিষ্ট পরিচয় না থাকলে সাধারণ কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। সামনে রাজনৈতিক অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেসব মোকাবিলায় নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় ছাত্রদলকে দ্রুত সুসংগঠিত করা জরুরি।

আমরা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি, কোনো ঝুলন্ত বা আংশিক সিদ্ধান্ত নয়—যোগ্যতা ও ত্যাগের মূল্যায়ন করে অবিলম্বে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগরে গতিশীল নেতৃত্ব উপহার দেওয়া হোক।”

বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের শীর্ষ দুই পদে আসীন হতে কেন্দ্রমুখী দৌড়ঝাঁপ করছেন প্রায় শতাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী। জেলা ছাত্রদলের শীর্ষ পদের আলোচনায় রয়েছেন সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান দোলন, সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি সুলতান মাহমুদ ও সাবেক সহ-সভাপতি মাসুদুর রহমান।

অন্যদিকে মহানগর ছাত্রদলে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাহিদ ইসতিয়াক সিকদার, সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইসলাম রাজিব ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ফারহান।

এ ছাড়া বন্দর সরকারি কদমরসূল কলেজের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান রিফাতসহ মাঠপর্যায়ের আরও একঝাঁক তরুণ ও সক্রিয় নেতাকর্মীও পদপ্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন।

তৃণমূলের এই হাহাকার ও সাংগঠনিক স্থবিরতার বিষয়ে কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগরের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা পূর্ণ অবগত।

কেন্দ্রীয় নেতাদের দাবি, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত কমিটি উপহার দেওয়া হবে। তবে এবার কোনো স্বল্পমেয়াদী আহ্বায়ক কমিটি না দিয়ে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের পরিকল্পনা করছে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ।

এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে কবে নাগাদ নারায়ণগঞ্জ ছাত্রদলের কাঙ্ক্ষিত নতুন কমিটি আলোর মুখ দেখে এবং স্থবির হয়ে পড়া রাজনৈতিক মাঠ আবার ছাত্রনেতাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *